গত বছর যখন গভর্নর পদে দায়িত্ব পাই তখনই চিন্তা করি কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে পারি। তখন মনে হয়েছিল এজন্য দুটো জিনিস দরকার। প্রথমত, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে হবে। কেননা অস্থিতিশীল বিনিময় হার দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা যায় না। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলেও বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর সেটি করতে গেলে রেমিট্যান্স লাগবে। বাংলাদেশে যে স্থিতিশীলতা সেখানে রেমিট্যান্সের ভূমিকা বিশাল, এটি অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। সদ্য বিদায়ী (২০২৪-২৫) অর্থবছরে আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। যেটি ব্যাপকভাবে অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের অবদান কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণ, এটির বেশির ভাগই যায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে। এটি শহরকেন্দ্রিক নয়, বহুলাংশে গ্রামভিত্তিক। ফলে এর প্রভাব ব্যাপক। রেমিট্যান্স দেশের আর্থিক খাতকে শুধু সাহায্য করছে না, সামাজিক রূপান্তরেও বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে কী হচ্ছে? গ্রামীণ অর্থনীতি ভালো হচ্ছে। গ্রামের শিশুরা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে। পারিবারিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আবাসিক ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এগুলো দৃশ্যমান। আমি শুধু এটুকুই বলব, গ্রামীণ অর্থনীতি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ব্যাপক শক্তিশালী।
রেমিট্যান্স নাকি গার্মেন্টস কোনটি বেশি অবদান রাখে, এখানে সেই প্রশ্ন উঠেছে। সামান্য হিসাব করে দেখলাম, বিদেশে আমাদের ১২ মিলিয়ন তথা ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী চাকরি করেন। আরএমজি খাতে অফিশিয়ালি বলা হয়, ৪০ লাখের মতো মানুষ যুক্ত। আসলে এ সংখ্যা ৩০ লাখের মতো হবে। এখানে প্রবাসী কর্মী তাদের চেয়ে তিন গুণের মতো বেশি। এটি একটি পার্থক্য। আরএমজিতে ৩৯ বিলিয়ন ডলার রফতানি হলেও ২৫-২৬ বিলিয়ন ভ্যালু অ্যাডিশন হয়। আর রেমিট্যান্সের পুরোটাই ভ্যালু অ্যাডিশন হিসেবে যুক্ত হয়।
রেমিট্যান্স থেকে আমরা ৩০ বিলিয়ন ডলার পাচ্ছি। এখানে প্রবাসীদের আরো ভালো করার সুযোগ আছে। আমি মনে করি, ৪৫ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এটি অন্যদিকে চলে যায়। আপনাদের (প্রবাসী) অনুরোধ করব, একটু সচেতন হোন। আপনারা যদি টাকাগুলো সরাসরি বাংলাদেশী কোম্পানি বা বাংলাদেশী ব্যাংকের সঙ্গে কানেকশন আছে এমন মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠান, তাহলে সেটি অন্যদিকে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনটি করলে রেমিট্যান্স আয় ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
প্রবাসীরা রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এতে সন্দেহ নেই। এখানে সরকারেরও কিছু ব্যর্থতা আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমরা দেখি, বাংলাদেশীদের মাথাপিছু আয় অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এখানে আমি সরকারি ব্যর্থতার কথাই বলব। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও দরকার। আমরা কারিগরি শিক্ষার দিকে না গিয়ে জেনারেল শিক্ষার দিকেই বেশি যাচ্ছি। সেজন্য আমাদের দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে না। যেটি করলে দ্বিগুণ, তিন গুণ বা ১০ গুণ পর্যন্ত বেতন বাড়তে পারে, সেটি ভাবছি না। আমরা যাচ্ছি অদক্ষ হয়ে, যদিও অনেকেই আইএ, বিএ পাস করা। কিন্তু দক্ষতার উন্নয়ন করে যাচ্ছি না। এ জায়গায় মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। যারা প্রবাসে আছেন, তাদের বলব আপনাদের সন্তানকে পড়ালেখা করানোর সময় ভাববেন কোথায় পড়ালে তাদের দক্ষতা বাড়বে। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব, সে একটি ডিগ্রি পাবে এ আশা করবেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে একজন গাড়িচালক মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করে। কিন্তু একজন বিএসসি বা এমএ পাস ছেলে ২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিও পাচ্ছে না। এটিই বাস্তবতা।
সবকিছু বিবিএ, এমবিএ ডিগ্রি দিয়ে হবে না। এমন কিছু করতে হবে যেটি আমার জন্য ও দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে লাখ লাখ তরুণ এমএ, বিএ ডিগ্রি নিচ্ছে। এতজনকে তো এ দেশে চাকরি দিতে পারব না। কোনো দেশেই সবাইকে চাকরি দেয়া সম্ভব না। এর বিকল্প কী? কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন হলে চাকরির বিকল্প নানা ক্ষেত্র তৈরি হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশীদের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আরো অনেক বাড়বে। জাপানে এখন বহু মানুষ যেতে পারছে। ভবিষ্যতে চীনেও যেতে পারবে। পূর্ব ইউরোপেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। সেবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খাত। সেটি হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডাক্তার বা মেইনটেন্যান্স যেটিই হোক; সবই সেবার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫৪ শতাংশ। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং কত? ১৮-১৯ শতাংশ। সেবা খাতে এত সম্ভাবনার পরও আমাদের দক্ষতা কতটুকু? খুবই কম বা লো কোয়ালিটি। এ জায়গায় যদি আমাদের ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করতে পারি তাহলে আয় ব্যাপক বাড়বে। এটি করলে নিজের ও দেশের জন্য ভালো হবে। মাথাপিছু আয় বাড়াতে হলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিন পক্ষের সমন্বয় হলে তবেই আমরা রেমিট্যান্সের প্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী করতে পারব এবং মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ-তিন গুণ করতে পারব।
ফিলিপাইনের মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে তিন গুণ বেশি। কারণ তারা ভাষা বিশেষ করে ইংরেজিটা খুব ভালোভাবে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন কাজ করেছি, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে দেখেছি ফিলিপাইনের নাগরিকদের। এটি খুবই আকর্ষণীয় চাকরি, কিন্তু এখানে দক্ষিণ এশীয়রা তেমন নেই। সেবা খাতে আমরা শিক্ষা ও মানসিকতার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী নার্সিংয়ের ব্যাপক মূল্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের দক্ষ লোক নেই। আমরা এটিকে অন্য চোখে দেখি। এ জায়গায় যদি আমরা পিছিয়ে পড়ি জাতি হিসেবে উন্নতি করতে পারব না।
আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে। দেশ এখন যে অবস্থায় আছে সেটি আগের তুলনায় অনেক ভালো। কিন্তু আমরা আরো অনেক ভালো থাকতে ও ভালো করতে পারতাম, সেটি পারিনি। ব্যক্তি থেকে সরকারি পর্যায় সবাইকে এক হয়ে দেশকে ভালো রাখতে কাজ করতে হবে। প্রবাসীদের বাংলাদেশে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। সবার সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
শিক্ষা ও মানসিকতার কারণে আমরা সেবা খাতে পিছিয়ে আছি। নার্সিং ক্ষেত্রে আমাদের কোনো অবদান নেই। বিশ্বব্যাপী নার্সের ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু আমাদের কোনো সরবরাহই নেই। নার্সিংকে আমরা অন্য চোখে দেখি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগত মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। সামাজিক মূল্যায়নের পরিবর্তন দরকার। তা না হলে দেশ উন্নত হবে না।
দেশেও নার্সিংয়ের অনেক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমরা ভালো নার্স পাচ্ছি না। এ খাতের উন্নতি না হলে আমরা জাতি হিসেবে নিজেরা নিজেদের সেবা দিতে পারব না। আমাদের হাসপাতালের মান কেন এত খারাপ। কেন আমাদের সিঙ্গাপুরে আসতে হয়। কেন আমরা নিজেদের বিকশিত করতে পারি না, সেটি ভাবতে হবে।
আমাদের সম্ভাবনা অনেক। সেটি ব্যক্তি পর্যায়ে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে। আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশ আজ যে অবস্থায় আছে, সেটি আগের অবস্থা থেকে ভালো। তবে আমরা আরো অনেক ভালো করতে পারতাম। সেটি নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও আমরা পারিনি। ব্যক্তি কিংবা জাতি হিসেবে আপনি-আমি এটি অনুভব করি যে বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারত।
ব্যক্তিগত, জাতিগত কিংবা সরকারি পর্যায়ে একসঙ্গে উন্নতি করতে হবে। এ উন্নতি একসঙ্গে না করলে হবে না। এখানে সরকারের কমিটমেন্ট তো অবশ্যই রয়েছে। আপনারা (অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিঙ্গাপুর প্রবাসীরা) দেশে বিনিয়োগ করবেন, সেটি আমরা চাই। শুধু রেমিট্যান্সের টাকা পাঠালে গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন হবে, নিজেদের উন্নতি হবে, বাড়ি-গাড়ি হবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের বড় কোনো উন্নতি হবে না।
আহসান এইচ মনসুর: গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক